নিজস্ব প্রতিনিধি , কাঠমান্ডু - নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যে থাকা কারণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। শুধু হিমবাহের বরফ গলে জল নেমে আসার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেনি। তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, মাটি ও পাথর মিশে যাওয়ায় নদীর স্রোত ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়ের সূত্র লুকিয়ে রয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায়।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং হিমল পর্বতমালার লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের উত্তরে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত বলে জানা গেছে। প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা একটি হিমবাহ ভেঙে প্রায় ১২০০ মিটার নীচে আছড়ে পড়ে। তার জেরেই বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসে। সেই জলের সঙ্গে মিশে যায় কাদা, মাটি ও ছোট-বড় পাথর। প্রবল গতিতে সেই স্রোত নেমে আসে পাহাড়ি উপত্যকার দিকে। নেপালের ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী নদীতে তৈরি হয় ভয়াবহ হড়পা বান। বিপর্যয়ের পর থেকেই চলছে উদ্ধারকাজ।
মাটি ও কাদার স্তর সরিয়ে উদ্ধার করা হচ্ছে দেহ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল, বরফের সঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ কাদা এল কোথা থেকে। প্রথমে এই বিপর্যয়ের সঙ্গে ভূমিকম্পের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। হিমবাহের বরফের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার সময় পাহাড়ি এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে সেই কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.২। ফলে প্রথম দিকে বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, মহাদেশীয় পাতের নড়াচড়া থেকেই হয়তো ভূমিকম্প হয়েছে। তার জেরে নদীর জলস্তর বেড়ে গিয়ে হড়পা বান তৈরি হয়েছে।
পরে উপগ্রহচিত্র ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।হড়পা বানের স্রোত পাহাড়ের ঢাল দিয়ে নীচে নামার সময় উপত্যকার পলি, বালি, আলগা মাটি ও পাথরও সঙ্গে নিয়ে যায়। তবে ভোটেকোশী নদীতে যে বিপুল কাদার পরিমাণ দেখা গিয়েছিল, শুধু উপত্যকার মাটি থেকে তা আসা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ গোরান একস্ট্রমের মতে, হিমবাহের নীচের অংশেই বিপুল পরিমাণ কাদামাটি ছিল।
সেটি গলে যাওয়ার পর বরফের অংশ ভেঙে পড়ে। ফলে জলের সঙ্গে সেই মাটিও নীচে নেমে আসে। এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে এসেছে। হিমালয়ের বিভিন্ন উঁচু এলাকায় বরফের নীচে দীর্ঘদিন ধরে মাটি ও শিলার স্তর জমাট অবস্থায় থাকে। দু'বছর বা তার বেশি সময় ধরে বরফের সঙ্গে জমে থাকা এই স্তরকে 'পার্মাফ্রস্ট' বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই পার্মাফ্রস্ট গলে যাওয়াও হিমবাহ ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
কোলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানী অ্যাল্টন বায়ার্স বলেন, 'হিমবাহটি যে পার্মাফ্রস্টের উপর ছিল, তা গলে যাওয়ায় বরফের আস্ত চাঁই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। পার্মাফ্রস্টের পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্বত এবং বরফের কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে ব্যাপক ধস নামতে পারে'। বায়ার্সের মতে, হিমবাহ বা পাহাড়ের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার পর একটি ধারাবাহিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। প্রথমে ধস, তার পরে নদীপথে জল ও মাটির প্রবল স্রোত, শেষে নিচু এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস-এই ভাবেই পরিস্থিতি এগোয়। নেপালের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি ধরা পড়েছে উপগ্রহচিত্রে। চিনের দেওয়া উপগ্রহচিত্র পরীক্ষা করে নেপাল সরকার জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে তিব্বতের গিরং কাউন্টি থেকে আসা লেন্দে খোলা নদীর পথ প্রথমে আটকে যায়। সেখানে অল্প সময়ের জন্য একটি অস্থায়ী জলাধার তৈরি হয়েছিল। পরে জমে থাকা জলের চাপ বাড়তেই সেটি ভেঙে যায়। সেই জলই লেন্দে খোলা নদী ধরে নীচে নেমে ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে মিশে যায়। ফলে দুই নদী ও তাদের অববাহিকায় আচমকা বিপুল জলের চাপ তৈরি হয়।
নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, ধাদিং জেলার কাছে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিক জলাধার আচমকা ভেঙে গিয়ে বন্যা তৈরি হওয়া অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও পার্মাফ্রস্টের পরিস্থিতিতে বদল আসায় ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শুধু হিমালয় নয়, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস ও ইউরোপের আল্পসেও একই ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে অন্তত দেড় কোটি মানুষ হিমবাহ-জাত হ্রদের বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে নেপালের এই বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে আগে থেকে কোনও অস্থায়ী হ্রদের অস্তিত্ব উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়েনি। এলাকায় ভারী বৃষ্টিরও কোনও পূর্বাভাস ছিল না। তাই ঘটনাটি আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এই বিপর্যয়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব কতটা ছিল, সেটিও এখনও নিশ্চিত নয়। বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয়ের ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ ও তার নীচের অঞ্চলগুলি চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। ওই সব এলাকায় নতুন করে বসতি বা বাণিজ্যিক পরিকাঠামো তৈরি না করার পক্ষেও মত রয়েছে তাঁদের। ভোটেকোশী নদীর ধারে যে এলাকায় বিপর্যয় ঘটেছে, সেখানে জনবসতি তৈরি করাই উচিত ছিল না বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের গতিবিধির উপর নিয়মিত নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত তাঁদের।
হড়পা বানে নিশ্চিহ্ন গ্রাম, স্বজন হারিয়ে বেঁচে ফেরার যন্ত্রণার কথা জানালেন তিনি
জুলিই আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক সফল চিত্রশিল্পী আর জনপ্রিয় মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে
মৃত্যু ৬২৬, নিখোঁজ বহু! ফের হড়পা বানের আশঙ্কায় হাই অ্যালার্ট নেপালে
মৃতদেহের গয়না চুরির অভিযোগেও গ্রেফতার, উদ্ধার বিপুল নগদ টাকা
আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে আশাবাদী কারাকাস, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা রডরিগেজের
হড়পা বানের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন বিপদের ভ্রুকুটি, ফুঁসছে ভোটেকোশী-ত্রিশূলী
নেপালে নিখোঁজ ভারতীয়দের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ! উদ্ধারে তৎপর দিল্লি, দেশে ফিরলেন অনেকে
ইতালির সংসার ছেড়ে প্রেমিকের ঘরে! ৪ সন্তানের মাকে ঘিরে চাঞ্চল্য
হড়পা বানে বিধ্বস্ত নেপালের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন, তিব্বত সীমান্তে কি কূটনৈতিক চাপ?
বিপদসীমার উপরে জলস্তর, সরোবর ফেটে গেলে ফের প্লাবিত হতে পারে বিপর্যস্ত এলাকা
নেপাল বিপর্যয়ে দায় এড়াল চিন! নেপালের অভিযোগ খারিজ, কাঠমান্ডু-বেজিং সম্পর্কে চিড়ের আশঙ্কা
রাস্তা-সেতু ধ্বংস, কাদার স্তূপে থমকে উদ্ধারকাজ, বাড়ছে উদ্বেগ
তুষারধসে নদীপথ আটকে বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তনেও বাড়ছে হিমালয়ের ঝুঁকি
তিব্বত থেকে জলের তোড়ে বিপর্যয়, বিহার-উত্তরপ্রদেশ সীমান্তেও সতর্কতা
ইক্রামুলকে নিয়ে হাসিনাপুত্রের অভিযোগ, বাংলাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ
মানচিত্রে নতুন পরিচয়, ২১টি এলাকা-সহ ৪ গিরিপথ ও হ্রদও তালিকায়
সেনেটে পাস রাশিয়া-বিরোধী বিল, চিন-ভারত-জাপান-সহ একাধিক দেশকে ঘিরে বাড়ছে চাপ
জেদ্দায় যৌথ সমঝোতার জল্পনা, ভারত-পাক সংঘাত হলে বদলাতে পারে কূটনৈতিক হিসাব
কমবয়সিদের নিরাপত্তায় আদালতের রায়
দুই ভারতীয় নৌকর্মীর মৃত্যু, হরমুজ প্রণালী দিয়ে উদ্বেগ কেন্দ্রের