6920505a0d803_download
নভেম্বর ২১, ২০২৫ বিকাল ০৭:৩৮ IST

কলকাতার ভূমিকম্প ইতিহাস , তিন শতকের কম্পনে কাঁপা এক মহানগর

নিজস্ব প্রতিনিধি (কলকাতা)-কলকাতা আজ এক আধুনিক, ব্যস্ত মহানগর হলেও এর মাটির নীচে লুকিয়ে আছে ভূমিকম্পের দীর্ঘ ইতিহাস। গঙ্গাবিধৌত বদ্বীপ অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকির হলেও পার্শ্ববর্তী হিমালয়ান ফল্ট লাইন ও পূর্বাঞ্চলের ভূগঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে শহরটি শৈশবকাল থেকেই কম্পনের অভিঘাত সহ্য করেছে। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি শুরু হয় ১৭৩৭ সালের এক ভয়ঙ্কর সকাল দিয়ে।

১৭৩৭: কলকাতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প - ১১ অক্টোবর ১৭৩৭। কলকাতার পুরনো নথি, ব্রিটিশ রেকর্ড ও সমসাময়িক বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন শহরটিতে ঘটে এক প্রবল ভূমিকম্প। কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তৎকালীন কলকাতার বহু ইমারত মুহূর্তে ধসে পড়ে। ঘরবাড়ি, বাজার, গুদামঘর—সব মিলিয়ে শহরের অর্ধেকেরও বেশি নির্মাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও ছিল শিউরে ওঠার মতো। বহু নথিতে উল্লেখ আছে—কম্পনের পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডসহ মোট প্রাণহানি দাঁড়ায় প্রায়  ৩০০০ থেকে ১০,০০০ মানুষের মধ্যে , বেসরকারি হিসেবে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই সময় জনসংখ্যা ছিল খুবই কম; ফলে এই মৃত্যু-সংখ্যা ছিল এক মহাবিপর্যয়ের প্রতীক। নদী ও খালের ধার ভেঙে পড়ে বহু নৌকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও কিছু গবেষক পরবর্তী সময়ে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবও এ বিপর্যয়ে যুক্ত ছিল কিনা—তা নিয়ে বিতর্ক তোলেন, কিন্তু ভূমিকম্পটি যে ইতিহাসে কলকাতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কম্পন—সে বিষয়ে কারও আপত্তি নেই।

১৯৩৪: বিহার-নেপাল কম্পনে কেঁপে ওঠে মহানগরী - ১৭৩৭-এর দুঃসহ স্মৃতি মুছে যেতে না যেতেই দুই শতাব্দী পর আবার কলকাতা অনুভব করে বড় ধাক্কা। ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্প ছিল ৮.১ মাত্রার—কেন্দ্র কলকাতা থেকে দূরে হলেও কম্পনের শক্তি তীব্রভাবে পৌঁছেছিল শহরে। বহু পুরনো বাড়িতে বড় ফাটল দেখা দেয়, কয়েকটি ভবন আংশিক ধসে পড়ে। জনজীবন কয়েকদিন অস্থির হয়ে পড়ে এবং প্রশাসন প্রথমবারের মতো শহরের ভবন নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্ব দেয়।

১৯৫০: আসামের ভূমিকম্প — আধুনিক কলকাতার আরেক বড় ধাক্কা। ১৯৫০ সালের আসাম ভূমিকম্প, যা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী কম্পন হিসেবে পরিচিত, কলকাতাকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। দশতলা ভবন তখনও তেমন ছিল না, কিন্তু যে বহুতলের কাঠামো ছিল, সেগুলো দুলতে থাকে মিনিটের পর মিনিট। বহু বাড়িতে চাঙড় খসে পড়ে, কিছু এলাকায় জলের পাইপ ফেটে যায়। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোতে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের রাস্তায় নেমে আসার বর্ণনা পাওয়া যায়।


২০০১ থেকে ২০১৫: দূরবর্তী বড় কম্পনেও কাঁপে কলকাতা। নতুন শতকের শুরুতে ২০০১ সালের গুজরাট ভূমিকম্প, ২০১১ সালের সিকিম কম্পন এবং ২০১৫ সালের নেপালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প—সবই কলকাতায় মাঝারি থেকে তীব্র কম্পনে অনুভূত হয়। বহুতল ভবনের আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় এই কম্পনগুলো মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। উচ্চ ভবনে ঝুলন্ত পাখা, লাইট ও জানালার কাঁচ দুলতে থাকে; বাসিন্দারা নিরাপত্তার খোঁজে বাইরে ছুটে আসেন।

কলকাতা ভূমিকম্প-জোন ৩–এ থাকায় এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও পুরোপুরি নিরাপদও নয়। নরম নদীবহিত মাটি, পুরনো বাড়ি এবং ঘনবসতির কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ক্ষতি বাড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞরা বরাবরই দিয়ে আসছেন।

তিন শতকের ইতিহাস বলছে—কলকাতা কখনো বড় কম্পনের কেন্দ্র না হলেও পার্শ্ববর্তী ভূকম্পনের অভিঘাত এ শহরকে বারবার কাঁপিয়েছে। আর সেই অভিজ্ঞতা শেখায়—ভয় নয়, প্রস্তুতিই এই মহানগরকে নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায়।

TV 19 Network NEWS FEED