নভেম্বর ২৭, ২০২৫ দুপুর ০১:২৬ IST

জিলিপির প্যাঁচে প্যাঁচে লুকিয়ে আছে নানা গল্প

নিজস্ব প্রতিনিধি , কলকাতা - শীতকাল মেলা আর জিলিপি - এই ত্রয়ী বাঙালির অনুভূতিতে এমন ভাবে মিশে আছে যে একটিকে বাদ দিলে অন্যগুলোর স্বাদই যেন অসম্পূর্ণ লাগে। ভোরবেলা গরম ডালপুরি বা কচুরির সঙ্গে টাটকা জিলিপির মিষ্টতা হোক বা পাড়ার মেলায় গিয়ে লালচে-কমলা রঙের কুণ্ডলী পাকানো সেই মিষ্টান্ন—জিলিপি বাঙালির জীবনে প্রায় এক সাংস্কৃতিক চিহ্নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই জনপ্রিয় মিষ্টির পথচলা মোটেও ভারতের বুকে শুরু হয়নি। এর শেকড় অনেক দূরে, প্রাচীন মিশরে।

ইতিহাস অনুসন্ধান করলে জানা যায়, জিলিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় আরবি ভাষার গ্রন্থ কিতাব-উল-তারিখে, যেখানে "জুলবিয়া" নামে একটি খাবারের উল্লেখ আছে। এটিকেই আজকের জিলিপির প্রাচীনতম রূপ বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তখনকার সময়ে এই জুলবিয়া বিশেষ উৎসব, বিশেষত রমজান মাসে ইফতারের সময় খাওয়া হতো। আজও ইরানে "জালাবিয়া" নামে এক প্রকার মিষ্টি জনপ্রিয়—যেখানে চিনির রসের পরিবর্তে থাকে মধু, জাফরান আর গোলাপজলের সুগন্ধ। স্বাদে আলাদা হলেও এর আকৃতি ও প্রস্তুত প্রণালী জিলিপির সঙ্গে আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ভারতের উপমহাদেশে জিলিপির আগমন ঘটে মূলত আরব  বণিকদের হাত ধরে। মধ্যযুগে আরব ও ভারতের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলে বহু বণিক পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন বন্দরে আসতেন। তাঁদের সঙ্গেই এসেছিল জুলবিয়ার রেসিপি, যা ধীরে ধীরে দেশীয় উপাদান ও রুচির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নিতে থাকে। উত্তর ভারতে এটি পরিচিত হয় "জলেবি" নামে, পূর্ব ভারতে "জিলিপি", আবার মধ্য ভারতে "অমৃত" বা "ইমারতি" নামে এক বিশেষ বৈচিত্র্য গড়ে ওঠে, যেখানে ময়দার বদলে উড়দ ডাল ব্যবহার করা হয়।

এবার প্রশ্ন ওঠে—জিলিপির এমন পাকানো বা প্যাঁচানো আকৃতি কেন? এর পেছনে রয়েছে খাদ্যবিজ্ঞানের সহজ যুক্তি। ব্যাটারকে খুব মোটা করে তেলে দিলে তা সমানভাবে মুচমুচে হয় না; ভেতরটা কাঁচা থেকে যায় এবং বাইরের অংশ দ্রুত শক্ত হয়ে যায়। তাই ব্যাটারকে ফানেল বা কাপড়ের নল দিয়ে সরু ধারায় তেলে দিতে হয়। কিন্তু সরু রেখাকে যদি সোজা লাইনে বেশি লম্বা করা হয়, তা সহজেই ভেঙে যেতে পারে। তাই একই জায়গায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্যাটার ফেলা হলে তা শক্ত ভিত্তি পায় এবং বড় আকারেও ভাঙে না। পাশাপাশি, প্যাঁচানো আকৃতি চিনির রসে ভালভাবে ডুবে গিয়ে রস শুষে নিতে সাহায্য করে।

জিলিপির জনপ্রিয়তা শুধু আকৃতি বা স্বাদের জন্য নয়—এটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে উঠেছে। উত্তর ভারতে দিওয়ালি, হোলি বা বিবাহ-অনুষ্ঠানে জলেবি বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে শীতকালের নাস্তায় যেমন জিলিপির আলাদা স্থান আছে, তেমনি পূজা-পার্বণে বা অতিথি আপ্যায়নেও এই মিষ্টি অবিচ্ছেদ্য।

ভারতের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে—নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা—এটির স্বতন্ত্র সংস্করণ দেখা যায়। নেপালে "জেতে বেরা" নামে এবং পাকিস্তানে মধু ও আখরোটের রস দিয়ে বিশেষ ধরনের জলেবি বানানো হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যে রমজান মাসে খেজুরের পাশাপাশি জালাবিয়া এখনও ইফতারের অন্যতম অঙ্গ।

আজকের যুগে জিলিপি বানানোর আধুনিক যন্ত্রপাতি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন ফ্লেভারের সংযোজন যতই বাড়ুক, এর মূল সৌন্দর্য রয়ে গেছে সেই সরু ব্যাটার ঘুরিয়ে দিয়ে তৈরি করা সোনালি প্যাঁচের মধ্যেই। শেকড় বিদেশে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশ এই মিষ্টিকে যে নিজের করে নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহেই আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও গ্রহণযোগ্যতার চমৎকার উদাহরণ।

আরও পড়ুন

তামার পাত্রে জল: প্রাচীন বিশ্বাস নাকি সত্যিই স্বাস্থ্যকর?
নভেম্বর ২৩, ২০২৫

চলুন সংক্ষেপে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক

অনির্দিষ্টকালের জন্য গতি পরিবর্তন উত্তরে হওয়ার , অকাল বৃষ্টিতে ভাসবে রাজ্য
নভেম্বর ২২, ২০২৫

অকাল বৃষ্টিতে ভাসবে রাজ্য

কলকাতা থেকে ৪ ঘণ্টার দুরত্বে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর স্থান
নভেম্বর ২২, ২০২৫

দুই দিনের ছুটি নিয়ে ঘুরে আসা যায় বড়ন্তি থেকে

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প কোথায় হয়? আপনার বাড়ি ভূমিকম্পপ্রবন অঞ্চলে নয় তো!
নভেম্বর ২১, ২০২৫

ভারতকে ভূমিকম্প ঝুঁকির ভিত্তিতে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে

কলকাতার ভূমিকম্প ইতিহাস , তিন শতকের কম্পনে কাঁপা এক মহানগর
নভেম্বর ২১, ২০২৫

কলকাতা ভূমিকম্প-জোন ৩–এ থাকায় এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও পুরোপুরি নিরাপদও নয়

TV 19 Network NEWS FEED