691970c534d2a_IMG_20251116_120527
নভেম্বর ১৬, ২০২৫ রাত ০৮:৩৫ IST

বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে খেয়ে নেন শামুক , তারপর! স্যাম ব্যালার্ডের করুণ গল্প

নিজস্ব প্রতিনিধি , ক্যানবেরা - বন্ধুত্বের আড্ডা, একটু হাসি-ঠাট্টা আর কিশোরসুলভ দুঃসাহস—এভাবেই শুরু হয়েছিল স্যাম ব্যালার্ডের গল্প। মাত্র ১৯ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির তরুণ রাগবি খেলোয়াড় স্যাম এক সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। একটি ছোট্ট কৌতুক, একটি বোকা চ্যালেঞ্জ—এটাই তাঁকে নিয়ে যায় এক করুণ পরিণতির দিকে।

সেদিন ছিল  উৎসবের রাত । স্যাম ও তার বন্ধু জিমি গ্যালভিনসহ আরও কয়েকজন মিলে পান করছিল। ঠিক তখনই গ্যালভিনের বাড়ির মেঝের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল একটি পিচ্ছিল স্লাগ। কথার ছলে প্রশ্ন উঠল—“এটাকে খেতে পারবি?” আর ঠিক সেই দুষ্টামির হাসির মধ্যেই স্যাম স্লাগটি মুখে পুরে ফেলল। বন্ধুরা ভেবেছিল, এটি শুধু এক মুহূর্তের মজা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই তাকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কোমায়, স্থায়ী পক্ষাঘাতে এবং শেষ পর্যন্ত অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

খাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই স্যামের শরীরে দেখা দিল অদ্ভুত উপসর্গ। তিনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন, পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করছিলেন। প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো এটি কোনো স্নায়বিক সমস্যা, কারণ স্যামের বাবা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানালেন—সমস্যাটা আরও ভয়াবহ। স্লাগটির মধ্যে ছিল "র‍্যাট লাংওয়ার্ম" নামে পরিচিত একটি পরজীবী, যার বৈজ্ঞানিক নাম  Angiostrongylus cantonensis।

মূলত ইঁদুরের দেহে বেঁচে থাকা এই পরজীবী ইঁদুরের মলের মাধ্যেমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। শামুক-ঝিনুক, স্লাগ, এমনকি কিছু জলজ প্রাণীও এই পরজীবীতে আক্রান্ত হতে পারে। স্যাম যে স্লাগটি খেয়েছিলেন, সেটি ছিল ঠিক এমনই একটি বাহক। সাধারণত মানুষের শরীরে প্রবেশ করলেও এই পরজীবী তার জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে পারে না—বরং পথ হারিয়ে মস্তিষ্কে চলে যায়। সেখানেই তৈরি হয় মারাত্মক প্রদাহ, যা সৃষ্টি করে ইওসিনোফিলিক মেনিনজাইটিস ।

স্যামের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটে। অসুস্থ হওয়ার অল্প সময় পরেই তিনি কোমায় চলে যান—একটানা ৪২০ দিন। জেগে ওঠার পর তিনি ছিলেন সম্পূর্ণভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। নিজের অবস্থান বদলানো, খাওয়া—সবই করতে হতো অন্যের সাহায্যে। শ্বাস নেওয়া, কথা বলা—সবকিছুই ছিল এক ধরনের সংগ্রাম। তবুও তার জ্ঞ্যান ছিল। বন্ধুরা তাকে দেখতে এলে তিনি চোখে জল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতেন। জিমি গ্যালভিন যখন সেদিনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, স্যাম নীরবে কেঁদে ফেলেছিলেন—বন্ধুরা নিশ্চিত হয়েছিলেন, স্যাম সবই বুঝতে পারছেন।

এই দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও স্যামের পরিবার, বিশেষ করে তার মা কেটি ব্যালার্ড, ছিলেন তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ছেলের যত্ন নিয়েছেন তিনি। স্যামকে ঘিরে ছিল পরিবারের ও বন্ধুদের অগাধ ভালোবাসা। ঠিক সেই ভালোবাসার পরিবেশেই ২০১৮ সালের নভেম্বরের এক সকালে স্যাম পৃথিবীকে বিদায় জানান। মৃত্যুর সময় তার চারপাশে ছিলেন তার প্রিয় ২০ জন মানুষ—কেউ হাত ধরে, কেউ মাথায় হাত রেখে বলছিলেন, “আমরা তোমাকে ভালোবাসি।”

স্যামের গল্প কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। অজান্তে বা দুঃসাহসের বশে কিছু খাওয়া কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার কঠিন উদাহরণ এটি। স্লাগ বা শামুকের মতো প্রাণী হয়তো ক্ষুদ্র, কিন্তু তাদের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে অদৃশ্য এবং প্রাণঘাতী পরজীবী। খাবার ভালোভাবে ধোয়া, অজানা কিছু না খাওয়া—এই সাধারণ সতর্কতাগুলো জীবন বাঁচাতে পারে।

স্যাম ব্যালার্ডের জীবনের গল্প তাই শুধু এক বেদনাদায়ক স্মৃতি নয়; এটি এমন একটি বাস্তব শিক্ষা, যা তরুণ-তরুণীসহ আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। জীবনের প্রতি একটু সচেতনতা—এটুকুই হয়তো অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

TV 19 Network NEWS FEED