নিজস্ব প্রতিনিধি , কলকাতা - বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ চাষাবাদের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির গুণগত মান ও উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে জৈব সারের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন একটি লাভজনক ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে কৃষক থেকে শুরু করে নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অল্প জায়গা, স্বল্প পুঁজি, শ্রম ও সময় দিয়ে এই সারের উৎপাদন করা যায় এবং বাজারে এর ভালো চাহিদা থাকায় আয়ের সুযোগও যথেষ্ট।
ভার্মি কম্পোস্ট হলো বিশেষ প্রজাতির কেঁচো, যেমন "Eisenia fetida" বা রেড উইগলার, এর মাধ্যমে জৈব বর্জ্য প্রাকৃতিকভাবে পচিয়ে তৈরি এক উচ্চমানের সার। গোরুর গোবর, শুকনো পাতা, খড়, শাকসবজির উচ্ছিষ্ট, চা পাতা ইত্যাদি খেয়ে কেঁচো যে মল ত্যাগ করে, সেটাই ভার্মি কম্পোস্ট। এটি দানাদার, কালচে রঙের এবং গন্ধহীন। এতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা মাটির গঠন উন্নত করে এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের মাটির স্বভাব অনুযায়ী ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
কি ভাবে উৎপাদন শুরু করবো
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের জন্য কয়েকটি সহজ ধাপ অনুসরণ করতে হয়—
১. স্থান নির্বাচন: ছায়াযুক্ত, উঁচু ও জল নিষ্কাশনযোগ্য জায়গা বেছে নিতে হবে। বর্ষার সময় যাতে বেড ভিজে না যায়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হয়।
২. বেড তৈরি: ইট, বাঁশ বা কাঠ দিয়ে ৩–৪ ফুট চওড়া এবং ২–২.৫ ফুট উঁচু বেড তৈরি করা যায়। উপরে প্লাস্টিক শেড বা টিনের ছাউনি দিলে সুফল পাওয়া যায়।
৩. কাঁচামাল প্রস্তুতি: ১৫–২০ দিন পচানো গোবর, পাতা, খড়, সবজির বর্জ্য ইত্যাদি স্তরে স্তরে বিছাতে হয়।
৪. কেঁচো প্রয়োগ: প্রতি ১০০ কেজি জৈব পদার্থে প্রায় ১–১.৫ কেজি কেঁচো দেওয়া যথেষ্ট।
৫. পরিচর্যা: বেডে সবসময় আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা জল ছিটিয়ে রাখতে হবে, তবে অতিরিক্ত জল যেন জমে না থাকে। রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে সুরক্ষা জরুরি।
৬. সংগ্রহ:সাধারণত ৪৫–৬০ দিনের মধ্যে সার পুরোপুরি প্রস্তুত হয়। এটি হাতে ঝুরঝুরে ও গন্ধহীন হলে সংগ্রহ করে শুকিয়ে নেওয়া হয়।
৭. প্যাকেজিং: বাজারজাত করার জন্য ১, ৫ বা ১০ কেজি করে ব্যাগে প্যাকেটজাত করা যায়।
সরকারি ট্রেনিং ও সাহায্য কি কি পাবো
পশ্চিমবঙ্গে সরকার কৃষকদের ও উদ্যোক্তাদের জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষি দপ্তর (Department of Agriculture): জেলা ও ব্লক কৃষি দপ্তর নিয়মিত ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেয়।
কৃষক বন্ধু প্রকল্প: অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হয়।
পশ্চিমবঙ্গ স্টেট রুরাল লাইভলিহুডস মিশন (WBSRLM): স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করে।
কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK):বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত KVK-গুলো ফ্রি বা ন্যূনতম খরচে ভার্মি কম্পোস্ট প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেয়।
নার্সারি ও জৈব কৃষি প্রকল্প:কিছু ক্ষেত্রে কেঁচো, বেড উপকরণ বা অন্যান্য সহায়তাও পাওয়া যায়।
বিক্রি কোথায় করব
ভার্মি কম্পোস্টের বাজার পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক বিস্তৃত। বিক্রি করা যায়—
* স্থানীয় কৃষকদের কাছে
* ফল, ফুল ও সবজি চাষিদের কাছে
* নার্সারি
* গার্ডেনিং শপ
* বিভিন্ন সমবায় সমিতি
* অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (ফেসবুক, ওয়েবসাইট, অনলাইন মার্কেট)
প্যাকেটজাত করে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার তৈরি সহজ হয়।
লাভ–ক্ষতির হিসাব
ধরা যাক তিনটি বেড দিয়ে কেউ কাজ শুরু করল—
প্রাথমিক খরচ: বেড তৈরির সামগ্রী, কেঁচো, ছাউনি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ১২,০০০–১৮,০০০ টাকা।
মাসিক উৎপাদন: প্রতি বেডে ৭০–১০০ কেজি ধরে মোট ২১০–৩০০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট।
বিক্রিমূল্য: পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত প্রতি কেজি ১২–১৮ টাকা।
মাসিক আয়: আনুমানিক ৩,০০০–৫,০০০ টাকা।
বার্ষিক আয়: ৪০,০০০–৬০,০০০ টাকার মতো।
একবার কেঁচো ও বেড তৈরি করে ফেললে বারবার খরচ কম হওয়ায় লাভের পরিমাণও বাড়তে থাকে।
ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ও গ্রামীণ জীবিকায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। কম পুঁজি, কম ঝুঁকি, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ও বাজারের নিরন্তর চাহিদার কারণে এটি দ্রুত আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। যারা জৈব চাষ, নার্সারি বা ক্ষুদ্র ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত উপযোগী। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সরকারি সহায়তা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যে কেউ সহজেই ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে স্থায়ী আয় করতে পারেন।
সোনা দীর্ঘদিন ধরে সেফ হেভেন অ্যাসেট হিসেবে পরিচিত
কোন সময় কোনটা ব্যবহার করব
তিন ধরনের ফান্ডের খুঁটিনাটি নিয়ে আজকের প্রতিবেদন
হামলার কথা স্বীকার ইজরায়েলের
সতর্কতামূলক পদক্ষেপ এয়ারবাসের
সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল ভিডিও
বিবৃতি জারি ট্রাম্প প্রশাসনের
আপাত বন্ধ স্কুল-অফিস