নভেম্বর ১১, ২০২৫ দুপুর ০১:০১ IST

লুই ভিট্টন: ছোট বাক্স নির্মাতা থেকে বিশ্বের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের শীর্ষে

নিজস্ব প্রতিনিধি ,প্যারিস - বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে “লুই ভিট্টন” (Louis Vuitton) নামটি এখন এক কিংবদন্তি। কিন্তু এই ব্র্যান্ডের শুরুটা ছিল একেবারে সাধারণ—এক তরুণ ছেলেকে ঘিরে, যার হাতে ছিল শুধু দক্ষতা, অধ্যবসায় আর স্বপ্ন।

লুই ভিট্টনের জন্ম ১৮২১ সালে, ফ্রান্সের ছোট একটি গ্রামে—Anchay-এ। শৈশবে তার পারিবারিক অবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। ১৩ বছর বয়সে তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে প্যারিসের পথে রওনা হন। প্রায় দুই বছর ধরে হেঁটে, নানা কষ্ট সয়ে অবশেষে তিনি পৌঁছান আলোর শহরে। সেখানে তিনি এক বাক্স নির্মাতা (trunk maker) হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময়ে ধনীরা দীর্ঘ ভ্রমণে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে যেতেন, আর তাদের জন্য শক্তপোক্ত, জলরোধী ট্রাঙ্কের চাহিদা ছিল প্রবল।

প্যারিসে কাজের মধ্য দিয়ে লুই বুঝতে পারেন—বাক্স বা লাগেজ তৈরির কাজ কেবল ব্যবহারিক নয়, এটি শিল্পও হতে পারে। ১৮৫৪ সালে তিনি নিজের নামে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন—“Louis Vuitton Malletier” । এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তিনি এমন একটি সমতল-ঢাকনাযুক্ত ট্রাঙ্ক তৈরি করেন, যা আগে কেউ ভাবেনি। প্রচলিত বাক্সগুলোর ঢাকনা ছিল গোল, তাই সেগুলো একটার ওপর আরেকটা রাখা যেত না। লুইয়ের নকশা ভ্রমণকারীদের জন্য বিপ্লব ঘটায়—এগুলো ছিল হালকা, টেকসই ও স্তূপযোগ্য।

তার দক্ষতা ও উদ্ভাবনশক্তির কারণে ফ্রান্সের সম্রাজ্ঞী ইউজেনি (Napoleon III-এর স্ত্রী) তাকে রাজকীয় বাক্স নির্মাতা হিসেবে নিয়োগ দেন। এর ফলে লুই ভিট্টনের নাম দ্রুত অভিজাত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তার ছেলে জর্জ ভিট্টন (Georges Vuitton) ব্যবসার হাল ধরেন এবং আরও উন্নত বিপণন কৌশল প্রয়োগ করেন।

১৮৯৬ সালে জর্জ তৈরি করেন ব্র্যান্ডটির বিখ্যাত  LV Monogram  —যেখানে লুই ভিট্টনের নামের আদ্যক্ষর ও ফুলের নকশা একত্রে ব্যবহার করা হয়। এই ডিজাইনই আজ ব্র্যান্ডটির মূল পরিচয়, যা নকল ঠেকানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও পরবর্তীতে এক শিল্পরূপে পরিণত হয়।

২০শ শতকের শুরু থেকে লুই ভিট্টন শুধু ট্রাঙ্ক বা লাগেজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ব্যাগ, জুতো, পোশাক, ঘড়ি ও পারফিউম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৮০-এর দশকে ব্র্যান্ডটি মিলে যায় Moët et Chandon এবং Hennessy-এর সঙ্গে, গঠিত হয়  LVMH (Louis Vuitton Moët Hennessy) —বিশ্বের বৃহত্তম বিলাসবহুল পণ্য গোষ্ঠী।

আজ লুই ভিট্টন শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, এটি এক জীবনধারা, এক মর্যাদার প্রতীক। এর দোকানগুলো বিশ্বের প্রতিটি বড় শহরে, আর প্রতিটি পণ্যে থাকে ঐতিহ্য, শিল্প ও নিখুঁত কারিগরির ছোঁয়া। হাতে বানানো প্রতিটি ব্যাগ বা লাগেজ এখনো সেই একই যত্নে তৈরি হয়, যেভাবে এক শতাব্দী আগে লুই ভিট্টন নিজে করতেন।
 

লুই ভিট্টনের গল্প শুধু ব্যবসার সাফল্য নয় — এটি অধ্যবসায়, উদ্ভাবন আর মানসিক শক্তির গল্প। এক দরিদ্র গ্রামের ছেলে কীভাবে স্বপ্ন, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে ফ্যাশনের এক অমর নাম হয়ে ওঠেন, সেটিই এই ব্র্যান্ডের প্রকৃত অনুপ্রেরণা।

TV 19 Network NEWS FEED