৭ আগস্ট ২০২৫, ধরালী গ্রাম। ছোট্ট এই পাহাড়ি গ্রামটি আজ এক ভয়াবহ হড়পা বানের সাক্ষী হলো, যা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো গ্রামকে তছনছ করে দিয়েছে। নদীর বন্যা প্রবাহে ভেসে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সেতু, রাস্তা,জীবিকার প্রতিটি উপায় থেমে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। প্রথম দিকে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা মেঘভাঙা বৃষ্টির তাণ্ডব ভাবা হলেও আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের তথ্য ও ভূতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা,প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞ মানবসৃষ্ট, পরিকল্পনাহীন ও অবৈজ্ঞানিক নির্মাণকাজের ফলাফল।
ক্লাউডবার্স্টের কল্পনা ভেঙে পড়ল সত্য
মৌসম ভবনের পরিসংখ্যান বলছে, ৭ আগস্টের আগের ২৪ ঘণ্টায় ধরালীর নিকটবর্তী এলাকা যেমন হরসিলে মাত্র ৯ মিলিমিটার, ভাটোয়ারিতে ১১ মিলিমিটার, আর উত্তরকাশীতে ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা একেবারেই ক্লাউডবার্স্টের সংজ্ঞার বাইরে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রোহিত তাপলিওয়াল স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, “এখানে ক্লাউডবার্স্টের কোনো ভূমিকা নেই, বন্যার তীব্রতা প্রাকৃতিক বৃষ্টির নয়।”
চারধাম হাইওয়ে প্রকল্পের ধ্বংসাত্মক প্রভাব
ভূতত্ত্ববিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা একমত, ধরালী ও আশেপাশের ভূপ্রকৃতির ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়েছে চারধাম হাইওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের কারণে। এই প্রকল্পে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে ৮৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ হচ্ছে, যা কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীকে সংযুক্ত করবে।
এই সড়ক নির্মাণের জন্য ৬৯০ হেক্টর বনভূমি উজাড় হয়েছে।
৫৫,০০০ গাছ কাটা হয়েছে।
২০ মিলিয়ন ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়েছে।
পাহাড় কাটার ফলে মাটির স্তর উন্মুক্ত হয়ে গেছে, যা হাড়হিম করা ভূমিধসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েক বছরে এই সড়কের সংলগ্ন এলাকায় ৮১১টি ভূমিধস ঘটেছে, যার ৮১ শতাংশই সড়কের ১০০ মিটার ভিতর।
ভৌগোলিক ও জলবায়ুর ভঙ্গুরতা
উত্তরাখণ্ডের ভূগোল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও জটিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০ মিটার থেকে শুরু করে ৬৯০০ মিটার পর্যন্ত পাহাড় বিস্তৃত। এখানে ১২০০টির বেশি গ্লেসিয়াল লেক রয়েছে, যাদের অধিকাংশ পাড় দুর্বল ও ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহের গলন বেড়ে যাওয়ায় এসব হ্রদের সংখ্যা ও আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভূ-প্রকৃতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
নদীতীরবর্তী অবৈধ নির্মাণ
পর্যটন উন্নয়নের নামে নদীর ধারে বিপুল হোটেল, রিসর্ট, দোকানপাট নির্মিত হয়েছে। বর্ষায় নদীর প্রস্থ বেড়ে গেলে বা হড়পা বান নেমে গেলে এসব অবকাঠামো মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়। ধরালীর ভিডিও ফুটেজে দৃশ্যমান, নদীর স্রোতে এসব ভবন খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। নদীতীরবর্তী অবৈধ নির্মাণ এক বড়ো ঝুঁকি।
২০১৩-এর কেদারনাথ দুর্ঘটনার পাঠ উপেক্ষিত
২০১৩ সালের কেদারনাথ মেঘভাঙার সময়ও নদীতীরবর্তী অবৈধ নির্মাণ ও পাহাড় কাটার কারণে বিপুল ক্ষতি হয়েছিল। সেখান থেকে শিক্ষার পরিবর্তে এই ভুল পুনরায় ঘটেছে, যার ফলাফল আজ ধরালীতে চোখে দেখা যায়।
আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ ও যাতায়াতের তথ্য
ধরালী গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান:
উত্তরকাশী জেলার উত্তরাংশে অবস্থিত, যেটি গঙ্গার উপত্যকার নিকটবর্তী। এই অঞ্চলের চারপাশে আছে হরসিল, ভাটোয়ারি, চামোলি, গুহটকাশি, রুদ্রপ্রয়াগ, দেবপ্রয়াগ। পর্যটক ও যাত্রীরা সাধারনত যমুনো নদীর ধারে প্রবাহিত এই অঞ্চলকে ঘিরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও তীর্থযাত্রার জন্য বিখ্যাত বলে মনে করেন।
যাতায়াতের সুবিধা:
হাওড়া থেকে পৌঁছানো:
হাওড়া (কলকাতা) থেকে ধরালী যেতে হলে প্রথমে বিমানে বা ট্রেনে দিল্লি অথবা জসপুর হয়ে গঙ্গনগর (দিল্লি) আসতে হবে।
দিল্লি থেকে রওনা হয়ে সরাসরি উত্তরাখণ্ডের পথে জাতীয় সড়ক ও হাইওয়ে ধরে উত্তরকাশী জেলার দিকে যাওয়া হয়।
কলকাতা থেকে বিমানে দিল্লি হয়ে রূপরেখা করা যেতে পারে, অথবা ট্রেন বা গাড়িতে উত্তর ভারতের রুট ধরে আসা যেতে পারে।
দিল্লি থেকে গাড়িতে হাওড়া-পাঠানকোট জাতীয় সড়ক ধরে প্রায় ১১-১২ ঘণ্টা সময় লাগে উত্তরকাশী পৌছাতে।
আশেপাশে কী আছে?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পর্যটন ও উন্নয়ন হলেও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা অতীব জরুরি। অপরিকল্পিত নির্মাণ, বন উজাড় ও পাহাড় কাটার ফলে ভূমিকম্প, ভূমিধস, হড়পা বানসহ আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে, উত্তরাখণ্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের জীবন দুর্বল হয়ে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আহ্বান
পরিবেশবিদ ও ভূতত্ত্ববিদরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, অবিলম্বে চারধাম প্রকল্পের নির্মাণ কাজে পরিবেশবান্ধব পন্থা গ্রহণ, বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার ও নদীতীরবর্তী নির্মাণ বন্ধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে। মানুষের অবহেলা না হলে এই অঞ্চলের পুনরুদ্ধার সম্ভব।
ধরালীর ধ্বংসযজ্ঞ প্রমাণ করে, প্রকৃতির প্রতিশোধ মানব অবহেলার চেয়ে বড়ো। দ্রুত সচেতনতা, পরিবেশ বান্ধব নীতি ও উন্নয়ন ছাড়া উত্তরাখণ্ডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এখনই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার,আমরা প্রকৃতির সঙ্গী নাকি ধ্বংসকারী?
আরও কড়াকড়ি হবে গ্রিন কার্ড
মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে বানভাসি অবস্থা পাঞ্জাবে
ফের পাকিস্তানকে সতর্কবার্তা ‘মানবিক’ ভারতের
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করার দাবি ট্রাম্পের
গাজার হাসপাতালে হামলায় শোকপ্রকাশ করেছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী