জানুয়ারী ১৭, ২০২৬ দুপুর ০২:১৮ IST

ট্রাম্পের পাগলামোতে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত! তৈরি ভাঙনের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিনিধি , কলকাতা - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত ন্যাটো শুধু একটি সামরিক জোট নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য, কৌশলগত স্বার্থ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। 

ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন গঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপ ছিল অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বিপর্যস্ত। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লকের প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশ সম্মিলিতভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়াশিংটন চুক্তির মাধ্যমে এই জোটের ভিত্তি স্থাপন হয়। ন্যাটোর মূল নীতি ছিল সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা, অর্থাৎ এক সদস্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ মানে তা সকল সদস্যের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে। এই নীতিই ন্যাটোকে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক কাঠামোতে রূপ দেয়। 

শীতল যুদ্ধের সময় ন্যাটো এবং সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ প্যাক্ট ছিল দুই বিপরীত শক্তির প্রতীক। ইউরোপের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য এই দুই জোটের মধ্যে শক্তির সমীকরণের উপর নির্ভর করত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ন্যাটো নতুন ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন সোভিয়েত প্রভাবাধীন ছিল, একে একে ন্যাটোর সদস্য হতে শুরু করে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পরে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জোটের ভৌগোলিক পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। 

২১ শতকে ন্যাটোর ভূমিকা শুধু ইউরোপের প্রতিরক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি। আফগানিস্তানে তালিবানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং লিবিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ন্যাটো বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ২০১৪ সালে ইউক্রেন সংকট এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর ন্যাটোর গুরুত্ব আবারও বেড়ে যায়। এরই প্রেক্ষাপটে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের মতো দীর্ঘদিন নিরপেক্ষ থাকা দেশগুলোর ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে। প্রথমত, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অনেক ইউরোপীয় দেশ নিজেদের সামরিক খাতে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে না, ফলে নিরাপত্তার ভার মূলত আমেরিকার কাঁধেই পড়ছে। এই আর্থিক ভারসাম্যহীনতা জোটের অভ্যন্তরে চাপ সৃষ্টি করছে। 

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মতপার্থক্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ন্যাটোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। কেউ ন্যাটোকে অপরিহার্য নিরাপত্তা বলয় মনে করেন, আবার কেউ এটিকে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার উৎস হিসেবে দেখেন। এই ভিন্নমত জোটের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে। 

তৃতীয়ত, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা ন্যাটোর কৌশলগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। ন্যাটোর সম্প্রসারণকে কেউ নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন এটি নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। 

তাই বর্তমানে , ন্যাটো এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসে এটি পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ভবিষ্যতে এই জোটের কাঠামো ও ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে। ন্যাটো ভেঙে পড়বে কিনা তা সময়ই বলবে, তবে স্পষ্ট যে এর সামনে চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।