নিজস্ব প্রতিনিধি , কলকাতা - ভারতীয় পুরাণ, লোককথা ও প্রাচীন সাহিত্যে এমন কিছু অলৌকিক সত্তার উল্লেখ আছে, যারা দেবতা নন, আবার সম্পূর্ণ মানবও নন। এঁদের ঘিরে রহস্য, ঐশ্বর্য, ভয় ও ভক্তির মিশেল—এই সত্তারাই যক্ষ ও যক্ষিণী। কখনও তাঁরা ধনসম্পদের রক্ষক, কখনও প্রকৃতির অভিভাবক, আবার কখনও মানবজীবনের কামনা-বাসনার প্রতীক। প্রাচীন শাস্ত্র ও ইতিহাসের পাতায় যক্ষ-যক্ষিণীর উপস্থিতি এক বিশেষ সাংস্কৃতিক ধারার সাক্ষ্য বহন করে।

বৈদিক সাহিত্যে ‘যক্ষ’ শব্দটি প্রথমে এক রহস্যময় শক্তি বা অতিপ্রাকৃত উপস্থিতিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অথর্ববেদ-এ যক্ষকে কখনও ভয়ংকর, কখনও পূজনীয় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে পুরাণ ও মহাকাব্যে যক্ষদের নির্দিষ্ট পরিচয় গড়ে ওঠে। মহাভারত-এ বিখ্যাত ‘যক্ষপ্রশ্ন’ পর্বে এক যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে নীতিবোধ ও জীবনের গভীর প্রশ্ন করেন। সেখানে যক্ষ জ্ঞানের প্রতীক, যিনি মানবকে পরীক্ষা করেন।

হিন্দু পুরাণে যক্ষদের অধিপতি হিসেবে পরিচিত কুবের, যিনি ধনসম্পদের দেবতা এবং উত্তর দিকের দিকপাল। তাঁর রাজ্য অলকাপুরীতে অসংখ্য যক্ষ বাস করেন বলে বিশ্বাস। তাঁরা মূলত ধনরত্ন, ভূগর্ভস্থ সম্পদ ও বৃক্ষ-লতা রক্ষা করেন। ফলে যক্ষদের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ ও উর্বরতার সম্পর্ক স্পষ্ট। যক্ষিণীরা তাঁদের নারীসঙ্গী—সৌন্দর্য, কামনা ও প্রাচুর্যের প্রতীক। অনেক প্রাচীন মন্দিরে বৃক্ষের ডালে ভর দিয়ে দাঁড়ানো যক্ষিণী মূর্তি দেখা যায়, যা উর্বরতার ইঙ্গিত বহন করে।
বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যেও যক্ষ-যক্ষিণীর উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধ গ্রন্থে তাঁরা কখনও বুদ্ধের উপাসক, কখনও স্থানীয় দেবতা হিসেবে চিত্রিত। জৈন ধর্মে প্রত্যেক তীর্থঙ্করের সঙ্গে এক যক্ষ ও এক যক্ষিণী রক্ষাকর্তা হিসেবে যুক্ত থাকেন। এতে বোঝা যায়, যক্ষ ধারণাটি কেবল হিন্দু ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রাচীন ভারতের বহুমাত্রিক ধর্মচিন্তার অংশ।

ইতিহাসের দৃষ্টিতে যক্ষ-যক্ষিণীর অস্তিত্ব মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে প্রতিফলিত। মৌর্য ও শুঙ্গ যুগে নির্মিত বিশাল পাথরের যক্ষমূর্তি আজও ভারতের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত। বিশেষ করে মধ্যভারতের ভাস্কর্যে যক্ষদের স্থূল, বলিষ্ঠ ও প্রভাবশালী রূপ দেখা যায়, যা প্রাচীন সমাজে তাঁদের জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। অনেক গবেষক মনে করেন, যক্ষ উপাসনা ছিল আর্য-পূর্ব লোকবিশ্বাসের অংশ, যা পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়।

যক্ষ-যক্ষিণী কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন; তাঁরা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতিপূজা ও সম্পদচিন্তার প্রতিফলন। ধন, বৃক্ষ, জলাশয় কিংবা গুহার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দেখায় যে মানুষ প্রকৃতির শক্তিকে দেবত্ব দিয়েই উপলব্ধি করত। সময়ের সঙ্গে তাঁদের রূপ বদলেছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে তাঁরা আজও জীবন্ত।
যীশুর বার্তা ছড়াতে চাই দাবি পোপের
নাসার আর্তেমেসিস ২ চন্দ্র অভিযান শেষ হওয়ার পরেই ট্রাম্পের পোস্ট ব্যাপক আলোচনার...
অভিজ্ঞতাহীন একজনকে দায়িত্ব দেওয়ায় উঠছে একগুচ্ছ প্রশ্ন
চুক্তি নিয়ে যদিও শুরু থেকে কোনো মাথাব্যথা ছিল না মার্কিন প্রেসিডেন্টের
জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এলাকায়