696cdc8dac13f_el_nino
জানুয়ারী ১৮, ২০২৬ রাত ০৯:৩৮ IST

এল নিনো আর এল নিনা , এই দুয়ের প্রভাবেই পরিবর্তন হয় আবহাওয়ায়

নিজস্ব প্রতিনিধি , কলকাতা - বিশ্বের আবহাওয়া যে শুধু মেঘ, বৃষ্টি বা রোদের খেলা—তা নয়। এই জটিল ব্যবস্থার পেছনে কাজ করে বিশাল সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর গড়ে ওঠা এমনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু ঘটনা হল এল নিনো ও লা নিনা। এই দুই অবস্থার প্রভাব শুধু দক্ষিণ আমেরিকা বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারত, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপের আবহাওয়াতেও। কখনও খরা, কখনও অতিবৃষ্টি—এই দুই বিপরীত চিত্রের নেপথ্যে প্রায়শই থাকে এল নিনো ও লা নিনা। 

এল নিনো কী - এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি অবস্থা। সাধারণত পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু বা ট্রেড উইন্ডস এই অঞ্চলের উষ্ণ জলকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে উষ্ণ জল আমেরিকার উপকূলের কাছে জমা হয় এবং সেখানে বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়। অন্যদিকে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। 

লা নিনা কী - লা নিনা হল এল নিনোর ঠিক বিপরীত অবস্থা। এই সময় ট্রেড উইন্ডস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে উষ্ণ জল আরও বেশি করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায়। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে, যাকে আপওয়েলিং বলা হয়। এই ঠান্ডা জলের প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে আবহাওয়া শুষ্ক ও ঠান্ডা হয়ে ওঠে, আর এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়। 

আবহাওয়ায় প্রভাব - এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব বৈশ্বিক। এল নিনোর সময় ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, ফলে খরা ও জলাভাব দেখা দিতে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা দেখা যায়। উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে শীত তুলনামূলকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। 

লা নিনার ক্ষেত্রে চিত্র উল্টো। ভারতে সাধারণত বর্ষা শক্তিশালী হয়, অনেক সময় অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায়ও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে শুষ্কতা ও খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। উত্তর গোলার্ধে কিছু অঞ্চলে শীত আরও তীব্র হতে পারে। 

দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব - এই জলবায়ু ঘটনাগুলি শুধু আবহাওয়ার খবরেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর ছাপ পড়ে। কৃষকরা ফসলের পরিকল্পনা করতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করেন। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ চাহিদা, এমনকি মৎস্য শিল্পও সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এল নিনো বা লা নিনার আগাম পূর্বাভাস অনেক দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

এল নিনো ও লা নিনা প্রকৃতির দুটি বিপরীত রূপ, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবীর জলবায়ু কতটা সংবেদনশীল ও পরস্পর নির্ভরশীল। এটি সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্বের নানা প্রান্তে বৃষ্টি, খরা, বন্যা কিংবা শীতের তীব্রতা বদলে দিতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞান ও উপগ্রহ প্রযুক্তির সাহায্যে এই ঘটনাগুলির পূর্বাভাস এখন অনেকটাই নির্ভরযোগ্য হয়েছে। তবে প্রকৃতির এই শক্তিশালী ছন্দের সঙ্গে  লড়াই না করে মানিয়ে নিয়ে সচেতন পরিকল্পনাই পারে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে আরও সুরক্ষিত রাখতে।